রাতে ঘুম না আসার রোগের নাম

রাতে ঘুম না আশা বা স্বাভাবিকভাবে ঘুম না হওয়ার চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ইনসোমনিয়া অনিদ্রা বা ঘুম না হওয়া রোগটি শুধু একটি কারণে হয় না ঘুমের প্রাকৃতিক কারণ এবং লক্ষণ ভেদেও চিকিৎসা ভাষায় বিভিন্ন নামে হয়ে থাকে। রাতে ঘুম না হওয়া বা অনিদ্রার বিষয়ে বিজ্ঞানে বিষয়টি অনেক বিস্তারিত রয়েছে।
রাতে-ঘুম-না-আসার-রোগের-নাম


পোস্ট সুচিপত্র: রাতে ঘুম না আসার রোগের নাম

প্রধান ঘুমের রোগ

রাতে সহযোগী ঘুম না আসা, বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া বা ভোরে ঘুম ভেঙে আর ঘুম না আসা এটি দুই ধরনের সমস্যার কারণে হয়ঃ
সারকাডিয়ান রিদম ডিসঅর্ডার এটি আমাদের দেহের একটি জৈবিক ঘড়ি আমাদের ঘুমানো স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ৩-৫ ঘন্টা বা তারও দেরিতে ঘুম আসা তরুণ শিক্ষার্থীর মধ্যে এটি বেশি দেখা দেয়। ঘুমানোর সময় শ্বাস না দিতে বাধা সৃষ্টির কারণেবারবার শ্বাস নিতে বাধা সৃষ্টি হয় যার কারনে আমাদের ঘুম ভেঙ্গে যায়। রাতে ঘুমানোর সময় পা চুলকানি বা পা টানাটানি কারণে পা নাড়াচাড়া তীব্র ইচ্ছা জাগে ফলে যায়।

ঘুম না হওয়ার প্রধান কারণ


অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা মানসিক চাপের কারণে আমাদের ঘুম হয় না। ল্যাপটপ, কম্পিউটার বা মোবাইল ফোন টিপার কারোনে স্ক্রিনে পড়া লাইট আমাদের চোখে পড়ার কারণে আমাদের ঘুম হয় না। আবার অতিরিক্ত চাপা কফি খাওয়ার কারণেও আমাদের ঘুমের চরম সমস্যা দেখা দেয়। প্রতিদিন আমাদের শরীরের বিভিন্ন বাতব্যথার কারণে ও আমাদের রাতে ঘুম আসে না চোখে। থাইরয়েডের সমস্যা, মেয়েদের পিরিয়ডের হরমোন পরিবর্তনের কারণেও ঘুম হয় না।

ভুল জীবন যাপন

আমাদের জীবনযাত্রায় অনেক ভুল থাকে এগুলো ভুলের কারণেও আমাদের রাতে ঘুম হয় না। ঘুমানোর আগে অতিরিক্ত ফোন বা ইলেকট্রনিক জিনিস টিপা আবার ঘুমানোর সময় বিছানার কাছে সেগুলো রাখবে ঘুমানো। এগুলোর কারণে আমাদের ঘুম আসে না আর ঘুম আসলেও গভীর ঘুম হয় না মাঝ রাতে বা ভোর রাতে ঘুম ভেঙ্গে যায় আর ঘুম আসে না। বিকেলবেলা বা সন্ধ্যাবেলার পর চা বা কপি ধূমপান বা নেশা করার কারণে ও আমাদের স্নায়ুতন্ত্র জড়িত হয়ে থাকে ফলে রাতে ঘুম আসে না।

প্রতিদিন আলাদা সময় ঘুমাতে যাওয়া এবং একই সময়ে সকাল বেলা ঘুম থেকে ওঠা এইসব অনিয়মিত ঘুমের কারণে আমাদের শরীরের জৈবিক ঘড়ি বৃদ্ধস্ত হয়ে পরে হলে আমাদের শরীরের পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুম হয় না। আবার রাতে ঘুমানোর আগে ভারী খাবার বা অতিরিক্ত মসলাদার খাবার খেলে আমাদের বদ হজম ও অ্যাসিড বা গ্যাস তৈরি হয় হলে আমাদের ঘুমের অত্যন্ত পরিমাণ বাধা সৃষ্টি করে। আবার আমাদের বেডরুম বা সবার ঘরে অতিরিক্ত লাইট, হৈচৈ, ঠান্ডা-গরম পরিবেশের কারণে ও আমাদের ঘুমের বাধা সৃষ্টি হয়।

অনিদ্রা কাটিয়ে তোলার উপায়

ঘুমানোর সময় আপনার বেডরুমের সব লাইট বন্ধ করে রাখবেন। অন্ধকার পরিবেশে আমাদের মস্তিষ্ক দ্রুত মেলাটনিন হরমোন তৈরিতে সাহায্য করে। ঘুম আসার জন্য শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা একটু কমানো প্রয়োজন তাই ঘরের তাপমাত্রা ১৮-২২ পর্যন্ত রাখা সবচেয়ে ভালো। হইচই গ্যাঞ্জাম বা শব্দ যাতে করে আপনার বেডরুম বা ঘরে আসতে না পারে এ বিষয়টা খেয়াল রাখবেন ঘুমানোর সময়। ঘুমানোর আগে অন্ততপক্ষে১-১.৫ ঘন্টা আগে ফোন, ল্যাপট, কম্পিউটার বা ইলেকট্রনিক সকল জিনিস অন্তত৬ মিটার দূরে রাখুন।

প্রতিদিন রাতে একই সময় ঘুমাতে যাবেন এবং সকালে একই সময় ঘুম থেকে উঠবেন এবং কি ছুটির দিনও একই সময় ঘুমাবেন এবং ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করবেন। বিকেলবেলা বা সন্ধ্যার আগে চা বা কফি খাওয়া বন্ধ করবেন। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে অন্ততপক্ষে ২০-২৫ মিনিট সূর্যের আলো গায়ে লাগাবেন এবং প্রতিদিন ৩০-৪০ মিনিট শারীরিক ব্যায়াম করবেন তবে ঘুমানোর অন্তত ১.৫-২ ঘন্টা আগে কোন ভারী ব্যায়াম করবেন না।
অনিদ্রা-কাটিয়ে-তোলার-উপায়


ঘুমানোর ১-২ ঘণ্টা আগে হালকা গরম পানি দিয়ে গোসল করবেন।গোসল শেষ করার সময় মনে হবে শরীরের তাপমাত্রা আরও বেড়ে গেছে কিন্তু বিষয়টা এমন না, আপনি যখন গোসল করে বের হবেন তখন আপনার হাত-পা রক্ত নালীগুলো খুলে যায়। তখন আপনার শরীরের ভেতরে তাপমাত্রা হাত পা এর রক্ত নালী দিয়ে বের হয়ে যায়। তবে গোসল করার সাথে সাথে ফ্যানের নিচে যাবেন না আর ঘুমানোর আগে ১ গ্লাস ঠান্ডা পানি খেয়ে নিবেন।

অন্যান্য ঘুমের রোগ

  1. সেন্ট্রাল স্লিপ অ্যাপনিয়াঃ- ঘুমানোর সময় গলার বেশি স্থির হয়ে যায়ে শ্বাসনালী বন্ধ হয়ে যায় হলে আমাদের ঘুম ভেঙ্গে যায়। এবং প্রচন্ড নাখ ডাকা শুরু হয় এবং রাতে ঘুমানোর সময় কয়েকশো বার কিছু মুহূর্তের জন্য শ্বাস বন্ধ হয়ে যায় ফলে মুখ দিয়ে শ্বাস গ্রহণ করে।
  2. নারকোলেপসিঃ- দিনে তীব্র ঘুমের আক্রমণ হয় এবং আপনি কোন কাজ করতে করতে বা কথা বলতে বলতে হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়া।
  3. স্লিপিং বিউটি সিনড্রোমঃ এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা টানা কয়েক দিন বা কয়েক মাস পর্যন্ত ২৪ ঘন্টার মধ্যে ১৮-২০ ঘন্টা ঘুমিয়ে দেন। এই রোগে প্রচুর পরিমাণ ঘুম ধরে।
  4. প্যারাসোমনিযমঃ- এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা ঘুমের মধ্যে হাটাহাটি করে। ঘুম ভেঙ্গে প্রচন্ড পরিমাণ ভয় পেয়ে চিৎকার করে তবে কি কারনে চিৎকার করেছে সেটা মনে থাকে না বা বলতে পারে না। ঘুম থেকে উঠার পর কয়েক সেকেন্ডের জন্য তারা কিছুই বুঝতে পারে না কোথায় আছে বা কোন দিকে আছে কোন দিক খুঁজে পায় নয়।
  5. REM প্যারাসোমনিযমঃ- এটা এমন একটি রোগ আপনি স্বপ্নে যেটা দেখেন বাস্তবেও সেটাই করবেন মানে ঘুমের মধ্যে হাত-পা নাড়াচড়া বা বিছানাতে লাফ দেওয়া বা স্বপ্নে কাউকে মারতেছেন বাস্তব জীবনেও ঘুমের মধ্যে আপনি ভাত দেওয়ালে মারে দিবেন এটা অত্যন্ত সাংঘাতিক একটি রোগ।

ইনসোমনিয়ার বিভিন্ন প্রকারভেদ 

ইনসোমনিয়াকে মূলত স্থায়িত্ব কারণ এইসবের ভিত্তিতে কয়েক ভাগে ভাগ করা হয়েছেঃ
  1. স্থায়িত্বের ভিত্তিতেঃ- একটি স্বল্পমায়াদিক বা অল্প সময়ের অনিদ্রা বা ঘুম না হওয়া। মানসিক চাপ বা মানসিক টেনশন এর কারনে ঘুম না হওয়া যদি কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত হতে পারে তবে এটা চিরস্থায়ী ভাবে হবে না।
  2. মূল কারণেঃ- অন্যান্য কোন মানসিক রোগীদের সরাসরি প্রভাবশালী স্বাধীনভাবে যে অনিদ্রা হয় না। অন্য কোন শারীরিক অসুস্থ বা মানসিক চাপ টেনশন বা কোন ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া এর কারনে এই ঘুম না হওয়ার সময়ের সাথে হয়ে থাকে।
  3. যেসব লক্ষণ দেখা দেয়ঃ- বিছানার শোয়ার পর প্রথমদিকে ঘুম আসতে অতিরিক্ত সময় লাগা। রাতে ঘুমিয়ে পড়ার পর মাঝ রাতে ঘুম ভেঙ্গে যাওয়া আর ঘুম আসে না। ভোরের দিকে বা সকাল-বড় অনেক আগে ঘুম ভেঙে যাওয়া এবং চেষ্টা কর ঘুম না আসলে। 

গভীর ঘুম না হওয়ার শারীরিক প্রভাব

আমাদের শরীরে জন্য ঘুম অত্যন্ত জরুরী যদি আমাদের পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুম না পায় তাহলে আমরা কোন কাজে মন বসাতে পারি না কিছুই করতে পারে না কিছু ভালো লাগে না। আর ঘুম না হওয়ার কারণে আমাদের মস্তিষ্কে তথ্য প্রক্রিজাতকরন এবং তার মনে রাখার ক্ষমতা কমে যায়। প্রতিদিনের কাজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বা দক্ষতাও কমে যায় আপনি যদি সঠিক সিদ্ধান্ত নেন তারপরেও আপনার মনে হবে আপনি কি আসলে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারলেন মানে দোটানোর মধ্যে রাখবে। শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণ না হলে ডিপ্রেশনে চলে যাওয়া ঝুঁকিও থাকে। ঘুম কম হলে স্টেড স্ট্রেস হরমোন বেড়ে যায় এবং আমাদের রক্তচাপ বাড়ায় দেয়।

দীর্ঘদিন ধরে অনিদ্রা বা ঘুম না হয় তাহলে আমাদের হৃদপন্ধনে ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। ঘুমন্ত অবস্থায় শরীর প্রদাহের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যসাইটোকাইন নামক এক ধরনের প্রোটিন তৈরি করে। ফলে পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুম না হলেআমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। এবং ঘন ঘন সর্দি-কাশি বা জ্বর এরকম রোগ দেখা দেয়। আমাদের পর্যাপ্ত পরিমাণ বোম না হলে ক্ষুদানিয়ন্ত্রণকারী হরমোন কমে যায় এবং ক্ষুধা বাড়ানো হরমোন বেড়ে যায় ফলে অতিরিক্ত ক্ষুধা লাগে এবং আমাদের প্রয়োজনও বেড়ে যায়। শরীরের বৃদ্ধি ওপেশীর মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় হরমোন খরন করে কমে যায়।

শেষ কথাঃ লেখকের মন্তব্য

আপনারও যদি ঘুম না হওয়া বা মধ্যরাতে ঘুম ভেঙ্গে যায় আর ঘুম ধরছে না তা হলে আপনি অবশ্যই আমি এতক্ষণ যেগুলো বললাম। আর আপনি যেগুলো করলেন এগুলো নিয়ম মেনে যদি আপনি চলতে পারেন তাহলে আশা করি আপনার অনিদ্রা বা ঘুম না হওয়ার সমস্যা কি হবে না আর কখনো। ঘুম না হওয়া আমাদের সাধারণত অনেক বড় একটি সমস্যা এটা যদি আমরা ঠিকমতো রাতে ঘুমাতে না পারি তাহলে দিনেরবেলা কোন কাজে মন দিয়ে করতে পারি না এবং আমাদের কিছুই ভালো লাগেনা। আর আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে যায় ফলে আমাদের শরীরে পরিমাণ ঘুম অত্যন্ত  গুরুত্বপূর্ণ।তাই আমার  নিয়ম অনুযায়ী চলেন তা হলে দেখবেন আপনার ঘুম না হওয়ার সঙ্গে সাথে একবারে সমাধান হয়ে গেছে।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

আপডেট আইডি ২৪ এরনীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url